Wednesday, April 20, 2022

অমরত্বের সন্ধানে ...

"জম্মিলে মরিতে হইবে, অমর কে কোথা কবে?" মাইকেল মধুসূদন দত্তের এই কবিতার লাইন আমাদের প্রত্যাহিক জীবনে ধ্রুবসত্যের মত। যা কিছু জীবিত, তার মৃত্যু অবধারিত! কিন্তু আসলেই কি তাই? 

(১)

আচ্ছা, মৃত্যু নিয়ে বলার আগে, এটা বোঝা দরকার জীবন বলতে আমরা কি বুঝি। আমরা সকলেই জীবন সম্পর্কে একটি ধারণা রাখি, কিন্তু জীবনকে সংজ্ঞায়িত করা কিন্তু খুবই কঠিন একটা বিষয়। এটা কেন কঠিন, সেটা তুলে ধরতে, একটা কাল্পনিক প্রেক্ষাপট চিন্তা করা যায়। ধরুন, আপনাকে একটি অজানা গ্রহে নিয়ে ছেড়ে দেয়া হল। আপনি জানেন যে, সেই গ্রহে বুদ্ধিমান জীব আছে। এখন স্বাভাবিকভাবেই সেই গ্রহের জীবেরাতো আর পৃথিবীর মত হবে না যে আপনি দেখলেই তাদের চিনে ফেলবেন। তাহলে কি দেখে আপনি জীবিত আর জড়ের মাঝে পার্থক্য করবেন? আপনি যদি এমন কিছু দেখেন, যা চলতে পারে, শব্দ করতে পারে, অন্যদের সাথে ভাব-বিনিময় করতে পারে, দেখতে পারে এবং প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে, তাহলেই কি তাকে জীবিত ধরে নিবেন?মানুষ কিন্তু ইতিমধ্যেই এমন কিছু হিউম্যানয়েড রোবট বানিয়েছে, যার মাঝে ঐ সবগুলো বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। আপনি যা দেখে জীব ভাবছেন, তা যে ঐ গ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীদের তৈরি কোন রোবট নয়,তা কিভাবে নিশ্চিত হবেন? আবার এমন কিছু যদি দেখেন যার মাঝে এই বৈশিষ্ট্য-গুলোর কোনটাই নেই, তাকে কি আপনি জড়-পদার্থ ধরে নিবেন? একটা বিরাট বটগাছের মাঝে উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলোর বেশির ভাগই নেই, কিন্তু গাছেরা যে জীবিত তা আমরা ভালভাবেই জানি। জীবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, প্রজনন বা নিজের মত বংশধর জন্মদানের ক্ষমতা। জড় পদার্থ সাধারণত প্রজনন করতে পারে না। কিন্তু এটিও পুরোপুরি সত্য নয়। উপযুক্ত পরিবেশে কিছু জৈবঅণু (যেমন- DNA এবং RNA) সয়ংক্রিয় ভাবে নিজের মত আরেকটি অণু তৈরি করতে পারে। এখন প্রজনন ক্ষমতাকে যদি জীবনের নির্ণায়ক ধরা হয়, তাহলে DNA বা RNA-কেও জীবিত বলতে হবে। এধরনের আরো বেশ কিছু জটিল কারণে, আজ পর্যন্ত জীবনের কোন পরিপূর্ণ সংজ্ঞা দেয়া যায়নি যা সব ধরনের জীবনের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা যায়। যেহেতু জীবনকে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন, আমি সে চেষ্টায় যাবো না, বরং জীবন বলতে আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে যা বুঝি সেটাকেই সঠিক ধরে নিবো। তো আমাদের এই ধারণা অনুযায়ী প্রতিটি জীবেরই স্বাভাবিক বা জৈবিক মৃত্যু আছে। আমাদের এই ধারণাটি কি পুরোপুরি সঠিক কিনা সেটা নিয়েই আজকের লেখা। 

(২) 

অমরত্বের পিছনে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই ছুটছেন। অমরত্বের তরিকা এখনো না পেলেও, কেন এবং কিভাবে আমরা ও অন্যান্য জীবেরা একটা সময় পর আস্তে আস্তে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হই, তা সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা বেশ অনেকখানি জ্ঞান ইতিমধ্যে অর্জন করেছেন। সহজভাবে, স্বল্পকথায় বললে, আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষ একটি নির্দিষ্ট সংখ্যকবার বিভাজিত হয়। নির্দিষ্ট সংখ্যকবার বিভাজিত হবার পরে আপনি যত যাই করেন কোষগুলো আর বিভাজিত হয়ে নতুন কোষের জন্ম দেয় না, এবং তারা নিজেও একটা সময় পরে মরে যায়। আস্তে আস্তে শরীরের কোষগুলো যখন মরে যেতে থাকে, শরীরও রুগ্ন হয়ে একসময় মারা যায়। তো বিজ্ঞানীরা যদি কোনভাবে কোষ বিভাজন প্রক্রিয়াটি চালিয়ে নেবার কোন পন্থা আবিস্কার করতে পারেন, তবে আমরা অমরত্বের অনেক কাছাকাছি চলে যাবো। এখানে বলে রাখি, ব্যপারটি কিন্তু এত সহজ-সরলও নয়। ক্যান্সার রোগটি কিন্তু কিছু কোষের বিভাজন বন্ধ না হওয়া বা অন্যকথায় কিছু কোষ অমরত্ব লাভ করার ফলেই হয়। সুতরাং কোষ বিভাজন চালিয়ে নিলেই হবে না, নানা কোষের মাঝে বিভাজনের সমন্বয়টাকেও ধরে রাখতে হবে। যাইহোক,অত জটিলভাবে চিন্তা না করে আপাতত এটুকু অন্তত বুঝার চেষ্টা করি যে, আমাদের শরীরের কোষগুলো একটা সময় পরে বিভাজিত হওয়া বন্ধ করে দেয় বলে আমাদের মৃত্যু হয়, কোনভাবে এই বিভাজন চালিয়ে নিতে পারলে অমরত্ব লাভ অথবা অন্তত আরো ২-৩ যুগ বেশি বেঁচে থাকা যেতে পারে। মূল প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কি আদো সম্ভব?

(৩)

জম্মিলে মরিতে হইবে, এই কথাটি সব প্রাণীর জন্য সত্য নয়। এককোষী ব্যাক্টেরিয়ার কথা চিন্তা করুন। ব্যাক্টেরিয়া যখন বুড়ো হয়, তখন তা মাঝ বরাবর দুইভাগে ভাগ হয়ে দুটি তরুণ ব্যাক্টেরিয়ার জন্ম দেয়। এই তরুণ ব্যাক্টেরিয়া-দ্বয় খাবার খেয়ে বড় হয়ে একসময় আবার নিজেরা বিভাজিত হয়ে নতুন প্রজন্মের জন্ম দেয়। এভাবেই চলে থাকে। এখানে নতুন ব্যাক্টেরিয়া জন্ম হচ্ছে ঠিকই কিন্তু কোন ব্যাক্টেরিয়ার কি জৈবিক মৃত্যু হচ্ছে? এককোষী বেশিরভাগ প্রানীর ক্ষেত্রেই জৈবিক মৃত্যুর ধারণাটি খাটে না। এককোষী থেকে এবার বহুকোষী প্রানীতে আসা যাক। হাইড্রা নামে একটি জলজ বহুকোষী প্রানী আছে, যারা ব্যাক্টেরিয়ার মতই যখন বেশি বড় হয়ে যায়, তখন মাঝ বরারর বিভক্ত হয়ে যায় এবং বিভক্ত অংশদুটিতে প্রয়োজনীয় অংগ-প্রত্যংগ তৈরি হয়। অমরত্বের সবচেয়ে বড় এবং শক্ত উদাহরণটি হচ্ছে, Turritopsis dohrnii নামক এক প্রজাতির জেলীফিস। এই জেলীফিস বৃদ্ধ হবার পর শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া উলটো দিকে ঘুরিয়ে আবার আস্তে আস্তে তরুণ হয়ে যেতে পারে, তারপর আবার বৃদ্ধ হতে পারে এবং আবার তরুণ হতে পারে, এবং এভাবেই আজীবন বেচেঁ থাকতে পারে। এখানে একটি বিষয় মনে করিয়ে দেই, আমি কিন্তু এখানে স্বাভাবিক জৈবিক মৃত্যুর কথা বলছি। জীবেরা কিন্তু অন্য নানা উপায়ে, যেমন- শিকারী প্রানীর আক্রমণের ফলে, খাদ্যেভাবে, পরিবেশগত দূর্যোগে বা দূর্ঘটনায় পড়ে নানা অস্বাভাবিক উপায়ে মারা যেতে পারে। সে যাইহোক, পৃথিবীর অনেক জীবের ক্ষেত্রেই তাই স্বাভাবিক জন্ম থাকলেও স্বাভাবিক মৃত্যু নেই! হাইড্রা বা জেলীফিস কোন একটি উপায়ে তাদের শরীরের কোষবিভাজন অব্যাহত রাখতে পারে। আর কিভাবে তারা এটি করে, সেটি পরিপূর্ণভাবে বুঝতে পারলে একদিন হয়তো মানুষের ক্ষেত্রেও তা প্রয়োগ করা যেতে পারে! হয়তো সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন মানুষ অমরত্ব না লাভ করলেও খুব সহজেই শতাধিক বছর বেচেঁ থাকতে পারবে!

(৪)

আমি ব্যক্তিগতভাবে অবশ্য মনে করি, মানুষ সত্যিকারের অমরত্ব লাভ করবে অন্য উপায়ে … আমার মতে, শরীরের অমরত্ব স্থায়ী কোন বিষয় না, কারণ শরীর ভঙ্গুর, আঘাত বা দূর্ঘটনায় সহজেই নষ্ট হয়ে যাবার মত। একটু অন্যভাবে যদি চিন্তা করি, আমাদের কোন জিনিসটি আমাদের একান্ত নিজস্ব, কোন জিনিসটি দিয়ে আমরা নিজে নিজেকে চিনতে পারি? আমাদের হাত-পা, চেহারা, শরীরের ভেতরের অংগ-প্রত্যংগ? না, এগুলা কিছুই না। হাত-পা ছাড়া মানুষ বেঁচে থাকতে পারে, চেহারা সার্জারি করে বদলে দেয়া যায়, সকল অংগ-প্রত্যংগই আজকের যুগে কম-বেশি প্রতিস্থাপনযোগ্য। আরো সরাসরিভাবে বললে, আমাদের পুরো শরীরটাই অবিকল ক্লোন করে বানিয়ে ফেলার প্রযুক্তি বর্তমানে আছে। যেটা আমাদের একান্ত নিজস্ব, যা দিয়ে আমরা নিজে নিজেদের অস্তিত্ব অনুভব করি, তা হচ্ছে আমার স্মৃতি। আমাদের ব্যক্তিত্ব, কার্যকলাপ, পরিবারের প্রতি ভালবাসা, আবেগ, জ্ঞান-গরিমা সবকিছুই কিন্তু ছোটবেলা থেকে জমা হওয়া অসংখ্য স্মৃতির মিলিত ফল। আর এই অসংখ্য স্মৃতি লিপিবদ্ধ আছে আমাদের মস্তিস্কে, জানা-অজানা হাজারো জৈব-অনুর ক্রিয়া-বিক্রিয়ায়, লক্ষ লক্ষ নিউরণের জটিল নেটওয়ার্কে! আমাদের মস্তিস্ক একটা অতীব শক্তিশালী জৈব-সুপার কম্পিউটার। এই কম্পিউটার কিভাবে কাজ করে তা বুঝতে পারলে, আর সেই কম্পিউটারের কিভাবে তথ্য জমা থাকে যা সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা হলে, একদিন হয়তো আমরা আমাদের সব স্মৃতি মস্তিস্ক থেকে ডাউনলোড করে, একটা সিলিকন চিপে বা হার্ড-ড্রাইভে জমা রাখতে পারতাম। তারপর নিজের ডিএনএ ব্যবহার করে নিজের জন্য নতুন একটা শরীর ক্লোন করে তাতে ঐ স্মৃতি আপলোড করে দিলেই হলো! ঐ নতুন শরীরে আমার স্মৃতি যখন জেগে উঠবে, তখন অনুভূতিটা হবে- ঘুম থেকে উঠে বয়স ৩০-৪০ বছর কমে গেছে- দেখার মতন। আমি জানি, এই কথা শুনতে কল্পকাহিনীর মতই লাগছে! কিন্তু বিজ্ঞান-ভিত্তিকভাবে কল্পনা করতে কোন দোষ নাই। আজ থেকে ৭০-৮০ বছর আগে বা তারও আগের লেখা বিজ্ঞান কল্পকাহিনীগুলো যদি কখনো পড়ে দেখেন, দেখবেন তখন তারা যা কল্পনায় দেখেছেন আজ তার প্রায় সবই বাস্তবতা! তেমনি আজকের কল্পবিজ্ঞান, কিছুকাল পরের সাধারণ বাস্তবতা!

(১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২)

No comments:

Post a Comment