সম্প্রতি আফগানিস্তানের ক্রিকেটার আহমাদ শেহজাদ মাঠে ভেপিং (ই-সিগারেট পান) করে আলোচনায় এসেছেন। এই ভেপিং বা ই-সিগারেট জিনিসটা নিয়ে আমাদের বেশির ভাগেরই জ্ঞান সীমিত। নামের সাথে যেহেতু সিগারেট যুক্ত আছে, তাই বেশির ভাগেরই ধারণা, এটিও নিশ্চয়ই সিগারেটের মতই ক্ষতিকারক হবে। ই-সিগারেট কি সাধারণ তামাকজাত সিগারেটের মত ক্ষতিকারক কিনা তা একটু পরেই আলোচনা করব। তার আগে কিছু গর্ব করার মত তথ্য দেই!!! তামাক বাংলাদেশের একটি অর্থকরী ফসল। পৃথিবীর মোট তামাকের ১.৩% বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। উৎপাদনের পরিমাণ হিসেবে বাংলাদেশ পৃথিবীতে ১২তম (তথ্যসুত্র-https://bit.ly/3uxzap2)। আমরা যেন এই র্যাংকিং-এ পিছিয়ে না যাই, তাই আমাদের নীতিনির্ধারকরাও সতর্ক। এ উন্নয়ন ও বৈদেশিকমুদ্রা লাভের খাতটি নিয়ে তারা অহেতুক বেশি কথা বলেন না। কথা-বার্তা বেশি বললেইতো লোকে উল্টাপাল্টা প্রশ্ন তুলবে! এছাড়াও গতবছর ১৫৩ জন সাংসদ এক হয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছেন যেন বাংলাদেশে ই-সিগারেট বৈধ করা না হয় (তথ্যসূত্র - https://bbc.in/3rFmZ7P)। দেশের ও দশের জন্য উনারা এত ভাবেন, এটা বুঝতে পেরে আমার আবেগে কান্না চলে এসেছিল। আচ্ছা, ভেবে দেখুন, ই-সিগারেট জনপ্রিয় হয়ে গেলে, তামাকের উৎপাদন কমে গিয়ে, আমাদের র্যাংকিং খারাপ হয়ে যাবে না?
সে যাইহোক, আসুন ই-সিগারেট নিয়ে 'প্রশ্ন ও উত্তর' আকারে কিছু সাধারণ জ্ঞান বিতরণের চেষ্টা করি... -ই-সিগারেট আসলে কি? ই-সিগারেট মূলত একটি রি-চার্জেবল ব্যাটারি চালিত ইলেকট্রনিক যন্ত্র। এটিতে একটি বৈদ্যুতিক কয়েল থাকে, যাকে ব্যাটারির চার্জ দিয়ে উত্তপ্ত করা যায়। কয়েলটি থাকে একটি ছোট ট্যাংকের মাঝে। এই ট্যাংকে আরো থাকে, ই-লিকুইড যা একধরনের তরল যা কয়েল উত্তপ্ত হলে বাস্পাকারে ই-সিগারেটের একটি নির্দিষ্ট জায়গা দিয়ে বের হয়ে আসে। এই বাস্পটিই ভেপাররা (যারা ভেপিং করে তাদের বলে ভেপার, যেমন, যারা স্মোক করে তারা স্মোকার) নিঃশ্বাসের সাথে গ্রহন করে। -ই-লিকুইডে কি থাকে? বিশ্বব্যাপী প্রসিদ্ধ ও অনুমোদিত ই-লিকুইড উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর ই-লিকুইডে মূলত ৪টি উপাদান থাকে- প্রোপাইলিন গ্রাইকল (পিজি), ভেজিটেবল গ্লিসারিন (ভিজি), নানাধরনের ফুড-গ্রেড ফ্লেভারিং এবং নিকোটিন।-ই-লিকুইডের উপাদানগুলো শরীরে জন্য কেমন ক্ষতিকারক? প্রোপাইলিন গ্লাইকল দীর্ঘদিন ধরে নানাধরনের ঔষধে বেইজ উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি একটি নিরাপদ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। ভেজিটেবল গ্লিসারিন প্রসাধনী শিল্পে বহুল প্রচলিত। শীতকালে আমরা অনেকেই ঠোঁট-ফাঁটা রোধে ঠোঁটে গ্লিসারিন দেই। এর স্বাদ কিছুটা মিষ্টি (অনেকে তাই ঠোঁটে লাগিয়ে আবার চেটে-পুটে খেয়েও ফেলে)। যাইহোক, এখন পর্যন্ত সহনশীল মাত্রায় গ্লিসারিন সেবনে ক্ষতিকারক কিছু পাওয়া যায় নাই। ই-সিগারেটে যে ফ্লেবারিংগুলো ব্যবহার করা হয়, তা মূলত নানাধরনের জুস, ড্রিংক, আইস্ক্রিম, চকোলেটেও ব্যবহার করা হয়। তাই এই ফ্লেবারিং নিয়েও অধিক চিন্তার কিছু নেই। বাকি থাকল নিকোটিন। নিকোটিন একটি উদ্ভিজ্জ উপাদান যা নানা গাছের পাতায় কম-বেশি থাকে, তবে তামাক গাছের পাতায় অনেক অনেক বেশি মাত্রায় থাকে। নিকোটিন একটি শক্তিশালী নেশা-জাতীয় জিনিস, যা নিয়মিত গ্রহন করলে তার উপর একটা নির্ভরতা তৈরি হয়, এবং একটা সময় কিছুক্ষণ পর পর নিকোটিন গ্রহন না করলে শারীরিক অস্থিরতা তৈরি করে। নিকোটিনের কারণেই মূলত মানুষ তামাকজাত দ্রব্যের নেশায় পড়ে। তবে নিকোটিন নিয়ে কিছু ভুল ধারণা আছে। অনেকেই মনে করেন, নিকোটিনের কারনে ক্যান্সার, হৃদরোগ ইত্যাদি নানা ভয়ংকর রোগ হয়। এই ধারণাটি সত্য নয়। ধূমপান বা তামাকজাত দ্রব্য সেবনে নানাবিধ রোগের ঝুঁকি বাড়ে তবে সেটি সরাসরি নিকোটিনের কারণে নয়। সিগারেটের ধোঁয়ায় প্রায় ৭০০০ রাসায়নিক উপাদান থাকে, যার মাঝে অন্তত ৬৯ টি কার্সেনোজেনিক (ক্যান্সার ঘটায় যারা) উপাদান আছে (তথ্যসূত্র -https://bit.ly/3LhsEsr)। মূলত এই অন্যান্য উপাদানগুলোর কারণেই তামাকজাত দ্রব্য পান বা সেবনে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। নিকোটিন একটি অত্যন্ত নেশাউদ্রেককারী উপাদান, তবে ওই নেশার অনুভূতির বাইরে এর তেমন কোন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি এখনো প্রমাণিত নয়। -ই-সিগারেট কি তাহলে সম্পূর্ণ নিরাপদ? না, আমি ই-সিগারেটকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলছি না। কেউ যদি কখনো ধূমপান না করে থাকে, তার শখ করে ই-সিগারেটে আসক্ত হবার কোন যৌক্তিক কারণ নাই। তবে ই-সিগারেট, সাধারন তামাকজাত সিগারেটের চাইতে অনেকগুন কম (প্রায় ৯৫%) ক্ষতিকর (রেফারেন্স-https://bit.ly/3HxOqpv)। কেন কম ক্ষতিকর, সেটি অনুধারন করাও কিন্তু খুব কষ্টসাধ্য নয়। ই-লিকুইডে কি কি উপাদান থাকে এবং সেই উপাদানগুলো যে তেমন ক্ষতিকারক নয়৷ তা আমরা স্পষ্টভাবে জানি। তাছাড়া আমরা চাইলেই ই-লিকুইডের নিকোটিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। অন্যদিকে সিগারেটে জানা-অজানা মিলিয়ে কয়েকশো ক্ষতিকর উপাদান আছে। প্রসিদ্ধ ব্রিটিশ মনোবিজ্ঞানী মাইকেল রাসেল বলেছেন, মানুষ নিকোটিনের জন্য সিগারেট খায়, কিন্তু মারা যায় 'টার' (সিগারেটের একটি ক্ষতিকর উপাদান) এর কারণে। আরো একটা ব্যাপার ভেবে দেখুন, সিগারেটে ধোঁয়া তৈরি হয় পাতা-কাগজ পুড়ে। অন্যদিকে ভেপিং-এ কোন ধৌঁয়া তৈরি হয় না, যা হয় তা হচ্ছে বাষ্প। তাই ঘরে বসে ভেপিং করলেও স্মোক ডিটেক্টরে এলার্ম বাজবে না। ধৌঁয়ার চাইতে বাস্প সংগতকারণেই শরীর ও পরিবেশের জন্য অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর। তাই যারা স্মোকার, তারা স্মোকিং ছাড়তে ভেপিং শুরু করতে পারে। এটি একটি ফলপ্রসু প্রক্রিয়া। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) খুব খোলাখুলি ভাবেই সিগারেটে বিকল্প হিসেবে ভেপিং-কে উৎসাহিত করে এবং ভেপিং যে অনেকাংশে কম ক্ষতিকর সেই তথ্য জনগণকে জানাতে কাজ করে। বিশ্বাস না হলে এই লিংকে গিয়ে যাচাই করতে পারেন, https://www.nhs.uk/live-well/quit-smoking/using-e-cigarettes-to-stop-smoking/ -ই-সিগারেট সেবন করতে কি অনেক টাকা লাগে? শুরুতে ইলেকট্রনিক ডিভাইস কিনতে এককালীন কিছু টাকা লাগে, কিন্তু সার্বিকভাবে ই-সিগারেট সেবনে সাধারণ সিগারেটের চাইতে অনেক অনেক কম খরচ হয়। তবে বাংলাদেশে যেহেতু এটি এখনো বৈধ নয়, সেখানে যন্ত্র বা ই-লিকুইড কিনতে অপেক্ষাকৃত বেশি খরচ হতে পারে। ই-সিগারেট নিয়ে আমি যে সাধারণ ধারণা দিতে চেয়েছিলাম তা আমি মোটামোটি দিয়ে দিয়েছি। শেষ করার আগে, আবার সেই সাংসদদের প্রসংগে ফেরত যাব। আমাদের রাজনীতিবিদদের অতীতের যা রেকর্ড তা আমাদের এই ধারণাই দেয় যে, তারা ভাল কাজে যতটা না এক হয়, তার চেয়ে খারাপ কাজে বেশি একাট্টা! ই-সিগারেট ঠেকাতে দেড়-শতাধিক সাংসদে নজির-বিহীন পদক্ষেপ কি আসলেই তাদের ভাল মানসিকতার ফলাফল? আমি ব্যক্তিগতভাবে কিন্তু অন্যকিছুর গন্ধ পাই! এমনতো হতেও পারে, সিগারেট কোম্পানিগুলো পর্দার আড়ালে ই-সিগারেটকে ঠেকাতে জায়গামত টাকা-পয়সা ঢালছে!
No comments:
Post a Comment